তাহসিফের মৃত্যুতে বাড়ছে রহস্য, দীপের বক্তব্যে অসংগতি

জাতীয়
তাহসিফের মৃত্যুতে বাড়ছে রহস্য, দীপের বক্তব্যে অসংগতি
৩০ অক্টোবর ২০২৬

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে থাকা বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্যে পাওয়া গেছে অসংগতি। গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে দীপ দাবি করেছিলেন, একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার পর দুজন আলাদা পথে চলে যান। তবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (পিবিআই) জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে ধাওয়া করা হলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং তিনি পালিয়ে আসেন। একই ঘটনার শেষ মুহূর্ত নিয়ে দুই ধরনের বর্ণনায় তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

গত বুধবার বিকেলে ঢাকার তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফ সাউরির (২৮) ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনিই।

পিবিআইয়ের হেফাজতে নেওয়ার আগে একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে দীপ জানান, তার ও তাহসিফের মোটরসাইকেল একই মডেলের। তাহসিফের বাইকটি অকেজো হয়ে পড়লে তিনি সেটি সচল করতে সহায়তা করেন। পরে দুজন উত্তরার একটি ওয়ার্কশপে গিয়ে বাইকের ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তনসহ প্রয়োজনীয় কাজ করান।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়ার্কশপ থেকে ফিরে তারা একটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে রাতের খাবার খান। এরপর তিনি নিজের বাসার দিকে এবং তাহসিফ অন্যদিকে চলে যান। তাহসিফ কোথায় বা কী কাজে গিয়েছিলেন, তা তিনি জানেন না বলেও দাবি করেন দীপ।

তবে পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া বর্ণনা ভিন্ন। সংস্থাটির এক পুলিশ সুপার গণমাধ্যমকে জানান, দীপ বলেছেন, ঘটনাস্থলে দুজন কথা বলার সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। এ সময় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ পালিয়ে আসেন। তার দেওয়া বক্তব্যসহ জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

দীপের দুই ধরনের বক্তব্যের কারণে তাহসিফের মৃত্যুর আগের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন করে সন্দেহ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কারা তাদের ধাওয়া করেছিল, কেনই বা তারা সেখানে উপস্থিত হয়েছিল এবং তাহসিফ কী পরিস্থিতিতে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।

এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর পর আলোচনায় এসেছে তার অতীতের কিছু ঘটনা। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশত্যাগের একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততার দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত রয়েছে। তবে ভিডিওটি তিনি ধারণ করেছিলেন বা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। বিষয়টি স্বাধীনভাবেও যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তাহসিফের পরিচিত ও ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, সম্প্রতি তিনি কয়েকটি হুমকি পেয়েছিলেন এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। মৃত্যুর আগে চাকরি থেকে অব্যাহতি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে তিনি কিছু কথা বললেও সব তথ্য প্রকাশ করেননি। তার বক্তব্য ছিল, ‘সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে।’

পরিবারের দাবি, যেখান থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই এলাকায় তিনি কখনো যাননি। ফলে কীভাবে সেখানে তার মৃত্যু হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং নিখোঁজ হওয়ার পরের কয়েক ঘণ্টায় তার সঙ্গে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে অতীতের কোনো ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। দীপের বক্তব্যের অসংগতি, সম্ভাব্য ধাওয়ার ঘটনা এবং মৃত্যুর আগে পাওয়া হুমকির বিষয়গুলো সামনে রেখে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার ও পরিচিতজনেরা।