পদ্মা-মেঘনার পানি খাবেন জেলা শহরের বাসিন্দারা

জাতীয়
পদ্মা-মেঘনার পানি খাবেন জেলা শহরের বাসিন্দারা
৩১ অক্টোবর ২০২৬

ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পদ্মা ও মেঘনা নদীর পানি শোধন করে দেশের আটটি শহরে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘ক্লাস্টার টাউন ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন’ নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ, লাকসাম, কুমিল্লা, ঈশ্বরদী, পাবনা, গোপালপুর ও নাটোরের বাসিন্দারা নদীর পানি শোধন করে সরবরাহের আওতায় আসবেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৮৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৪৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ ১ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ডিপিএইচইর পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেঘনা নদীর পানি ব্যবহার করে চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ, লাকসাম ও কুমিল্লা শহরে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে পদ্মা নদীর পানি শোধন করে ঈশ্বরদী, পাবনা, গোপালপুর ও নাটোর পৌরসভায় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

ডিপিএইচইর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) এহতেশামুল রাসেল খান বলেন, ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে সরকার ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যেই কয়েকটি শহরের জন্য নদীর পানি শোধন ও সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রকল্প এলাকার কয়েকটি শহরে নিরাপদ পানীয় জলের সংকট প্রকট। ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা বেশি এবং কোথাও কোথাও পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এসব সমস্যা বিবেচনায় প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে পুরো উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

যেসব কারণে প্রকল্পের উদ্যোগ

ডিপিএইচইর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পভুক্ত আটটি শহরের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ নিম্নমানের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন। পুরোনো ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো, বিশেষ করে পানি সরবরাহে ব্যবহৃত পিভিসি পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্ধেকের বেশি পানি অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থানে দূষিত পানি প্রবেশ করে সরবরাহ ব্যবস্থার গুণগতমান নষ্ট করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

গৃহস্থালি ও অন্যান্য সংযোগে পানির মিটার না থাকায় অপচয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী পানির পরিমাণ ও গুণগতমান নিশ্চিত না হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমছে।

ডিপিএইচই বলছে, ঈশ্বরদী ক্লাস্টারের ঈশ্বরদী, পাবনা, নাটোর ও গোপালপুর পৌরসভা এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা বেশি। এসব এলাকায় পানির স্তরও অনেক নিচে। একইভাবে কুমিল্লা ক্লাস্টারের কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, লাকসাম, বরুড়া, চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক ও আয়রনের উপস্থিতি উদ্বেগজনক এবং পানির স্তর নিচে নেমে গেছে।

প্রকল্পের আওতায় পুরোনো পানি সরবরাহ অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য ইনটেক পয়েন্ট, পানি শোধনাগার এবং সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপনও পরিকল্পনার অংশ।

আটটি শহরের মধ্যে ছয়টির স্যানিটেশন কার্যক্রম ডিপিএইচইর অন্য প্রকল্পের আওতায় চলমান রয়েছে। বাকি দুটি পৌরসভা—হাজীগঞ্জ ও গোপালপুরে স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নও এ প্রকল্পের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনে পিইসি সভা

প্রকল্পটির প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর পর গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া।

সভায় তিনি প্রশ্ন তোলেন, কুমিল্লা ও ঈশ্বরদী অঞ্চলকে ক্লাস্টার হিসেবে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড কী। দেশের আরও অনেক জেলা ও অঞ্চলে নিরাপদ পানি এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার সংকট রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জবাবে ডিপিএইচই জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের কারণে সারা দেশেই নিরাপদ পানির সংকট রয়েছে। তবে এলাকাভিত্তিক সমস্যা বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পুকুর ও খাল সংস্কারের মাধ্যমে পানি সরবরাহের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ রয়েছে।

ডিপিএইচই আরও জানায়, ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বছরজুড়ে পানির প্রাপ্যতা এবং দূষণমুক্ত পানি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন পার্বত্য চট্টগ্রামে সমন্বিত ও টেকসই পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় ঈশ্বরদী ও কুমিল্লা ক্লাস্টারের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। সেই যাচাইয়ের ভিত্তিতেই আলোচ্য প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।

পিইসি সভায় কুমিল্লা ক্লাস্টারের বরুড়া পৌরসভাকে প্রকল্পের আওতায় না রাখার বিষয়টিও উঠে আসে। ডিপিএইচইর পক্ষ থেকে জানানো হয়, অসাবধানতাবশত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) বরুড়া পৌরসভার নাম বাদ পড়েছিল। পরে প্রকল্প এলাকা পুনর্গঠনের সময় বরুড়া পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সভায় উপস্থিত সদস্যরা একমত হন।

এডিবির ঋণে সম্মতি, পরিবেশগত ছাড়পত্রের সুপারিশ

প্রকল্পটির অর্থায়নে এডিবি ঋণ দিতে সম্মতি জানিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্মসচিব খাদিজা পারভীন। তিনি বলেন, গত ১৪ থেকে ১৮ জুন প্রকল্পটি নিয়ে এডিবির ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই মিশনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি পাওয়া গেছে।

প্রকল্পটি ২০২৬ সালের পাইপলাইনে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের নমনীয় ঋণের প্রস্তাবসহ এডিবির চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। পিইসি সভায় সুপারিশ করা হলে ঋণ নিয়ে দরকষাকষি শেষ করে চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তবে নদী থেকে পানি উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যাচাইয়ের বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটির প্রতিনিধি প্রকল্পের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) ছাড়পত্র নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।

এ ছাড়া প্রকল্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে তা ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট শহরগুলোতে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও জলবায়ু সহিষ্ণু পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আশা করছে ডিপিএইচই। তবে প্রকল্পটি এখনো প্রস্তাব ও মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে।