৬৬৬ কোটি টাকা কর
হাইকোর্টের রায় স্থগিতের আবেদনে সাড়া পায়নি ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণ
পাঁচ করবর্ষের ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ টাকার বেশি আয়কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থেকে আপাতত রেহাই পেল না ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ। হাইকোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির করা আবেদন কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের চেম্বার আদালত আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেন। আদালত বলেন, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখে ওই রায়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।
এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়করের বৈধতা নিয়ে করা রুল খারিজ করে রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের বেঞ্চ এ রায় দেন।
হাইকোর্টের ওই রায়ের ফলে ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ করবর্ষের জন্য এনবিআরের দাবি করা আয়কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়।
রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে গ্রামীণ কল্যাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম মহিউদ্দিন চৌধুরী আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেন। সোমবার শুনানির জন্য আবেদনটি আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে।
আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ-আল-মামুন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ আজাদ।
শুনানি শেষে আইনজীবী আবদুল্লাহ-আল-মামুন সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে লিভ টু আপিল করার সুযোগও তৈরি হয়নি। সেই সময় পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার আবেদন করা হয়েছিল। তবে চেম্বার আদালত জানিয়েছেন, লিখিত রায় না থাকায় এ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ আজাদ বলেন, গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষ থেকে চেম্বার আদালতে একটি বিবিধ আবেদন করা হয়েছিল। আদালত আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন।
যেভাবে শুরু হয়েছিল আয়কর বিরোধ
২০১৭ সালের ৭ ও ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার ১৪ নম্বর কর অঞ্চল থেকে গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এতে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটির কাছে মোট ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়কর দাবি করা হয়।
গ্রামীণ কল্যাণকে দুই সপ্তাহের সময় দিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত দিনে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের জন্য আরও এক মাস সময় চাওয়া হয়। তবে কর অফিস সেই আবেদন নাকচ করে ২৬ সেপ্টেম্বর আদেশ দেয়।
ওই আদেশ পুনর্বিবেচনার জন্য গ্রামীণ কল্যাণ আবেদন করলেও ১৪ নভেম্বর সেটিও খারিজ করা হয়। পরে কর অফিসের দুই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট করে প্রতিষ্ঠানটি।
এসব রিটের শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর আদালত রুল জারি করেন। কর অফিসের ২৬ সেপ্টেম্বর ও ১৪ নভেম্বরের আদেশ কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আয়কর দাবির নোটিশের কার্যকারিতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় এ স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
হাইকোর্টে একাধিক ধাপে মামলা
২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলটি পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করেন। ওই রায়ে ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর ১৪ নম্বর কর অঞ্চলের দেওয়া আদেশ বাতিল করা হয়।
হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে এনবিআর পৃথক লিভ টু আপিল করে। পরে ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে মামলার মূল বিষয়বস্তুর ওপর হাইকোর্টে শুনানির নির্দেশ দেন।
এরপর শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট রিট খারিজ করে রায় দেন। তবে ওই রায় ৪ অক্টোবর প্রত্যাহার করা হয়। পরে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে গেলে তিনি রুল শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন।
সেই নতুন বেঞ্চেই চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর রুল খারিজ করে রায় দেওয়া হয়। এবার ওই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে গ্রামীণ কল্যাণের করা আবেদনও আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে বাদ পড়ে গেল।


