এল নিনোর প্রভাবে ৬ মাসে সাড়ে ৪ লাখের বেশি মৃত্যুর শঙ্কা

অন্যান্য
এল নিনোর প্রভাবে ৬ মাসে সাড়ে ৪ লাখের বেশি মৃত্যুর শঙ্কা
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের নতুন গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, আগামী ছয় মাসে অতিরিক্ত গরমের কারণে বিশ্বে ৪ লাখ ৫১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। গবেষকদের হিসাবে, সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সময়ে এল নিনোর কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়তি তাপজনিত মৃত্যুর এই হিসাব করা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে উষ্ণ ও তুলনামূলক দরিদ্র দেশগুলো। বিশেষ করে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা বেশি।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের গবেষকদের হিসাবে, এবারের এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের স্থলভাগের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত উষ্ণ দিন বা চরম গরমের দিনের সংখ্যা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একক দেশ হিসেবে নাইজেরিয়ায় সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩১ হাজার ৪০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৯ হাজার ৩০০ এবং সুদানে প্রায় ১৭ হাজার ৬০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস রয়েছে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভারতে প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে প্রায় ১৩ হাজার ৩০০ মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।

এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশেও অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে গবেষণাভিত্তিক পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সময়ে দেশে ৬০০-এর বেশি অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে বলেও এতে বলা হয়েছে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও গবেষণাটির সহলেখক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, তাপের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এমন এলাকাগুলো হলো যেখানে আগে থেকেই তাপমাত্রা বেশি এবং মানুষের আয় তুলনামূলক কম। সেখানে আরও কয়েক ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানুষের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

গবেষকদের মতে, ধনী দেশগুলোর তুলনায় দরিদ্র দেশগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত। ফলে অতিরিক্ত গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকিও এসব দেশে বেশি হতে পারে।

ভারতে তাপঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এনআরডিসির বিশেষজ্ঞ অভিয়ন্ত তিওয়ারি বলেন, শুধু তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করাই যথেষ্ট নয়; মানুষের জীবন রক্ষায় এসব সতর্কতা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ৩ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিল, এল নিনো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে খুব শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এল নিনো স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।

ডব্লিউএমও আরও জানিয়েছে, শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন পরিবর্তন করতে পারে এবং চরম তাপ, খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে এর প্রভাব একই মাত্রার হবে না; স্থানীয় মৌসুম ও অন্যান্য জলবায়ুগত পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব নির্ভর করবে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের বর্তমান গবেষণা সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ সময়কে কেন্দ্র করে করা হলেও গবেষকদের মতে, এল নিনোর তাপজনিত প্রভাব আরও কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। ফলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপের প্রভাব গড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের নিরক্ষীয় সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রবণতা। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

ডব্লিউএমওর মতে, এল নিনো সাধারণত কয়েক বছর পরপর দেখা দেয় এবং এর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়। চলতি এল নিনোর সঙ্গে অস্বাভাবিক উষ্ণ সমুদ্র ও অন্যান্য জলবায়ুগত কারণ যুক্ত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।