মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ৯০০ বছর পূর্তি মালদ্বীপে

ধর্ম
মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ৯০০ বছর পূর্তি মালদ্বীপে

ছবি: সংগৃহীত

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বৌদ্ধ রাজ্য থেকে ইসলামী সালতানাতে রূপান্তরের ঐতিহাসিক অধ্যায়ের ৯০০ হিজরি বছর পূর্তি উদযাপন করছে ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ৫৪৮ হিজরি বা ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দে দেশটিতে ইসলাম আগমন করে। এ উপলক্ষে রোববার দেশজুড়ে ধর্মীয় আলোচনা, খুতবা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু। দেশটির বিভিন্ন মসজিদ ও স্থানে ইসলাম আগমনের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে ধর্মীয় আলোচনা ও খুতবার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এ উপলক্ষে হুলহুমালেতে ‘সুলতান মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ গ্র্যান্ড মসজিদ ও ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্র’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। মালদ্বীপে ইসলামী যুগের সূচনার সঙ্গে যার নাম জড়িয়ে আছে, সেই শাসকের নামেই কেন্দ্রটির নামকরণ করা হয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

মালদ্বীপে ইসলাম আগমনের বহু আগে থেকেই মানুষের বসবাস ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের অধিবাসীদের একটি বড় অংশ ভারতীয় উপমহাদেশ ও শ্রীলঙ্কা থেকে দ্বীপগুলোতে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধধর্ম মালদ্বীপের প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। কয়েক শতাব্দী ধরে দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ ও স্থাপনা সেই সময়ের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।

ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে মালদ্বীপের অবস্থানও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। আরব ও পারস্যের মুসলিম বণিকরা ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এই যোগাযোগের ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগেই মালদ্বীপের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কড়ি শামুকের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিল মালদ্বীপ। দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ কড়ি শামুক রপ্তানি হতো, যা এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। শুকনো টুনা মাছ, নারকেল ও নারকেলে

মালদ্বীপের প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১১৫৩ সালে দেশটির ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে। ওই সময় বৌদ্ধ রাজা ধোভেমি ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে তিনি মুসলিম নাম ও উপাধি হিসেবে সুলতান মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ গ্রহণ করেন।

তার ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে আবু আল-বারাকাত ইউসুফ আল-বারবারি নামে এক মুসলিম আলেম ও ইসলাম প্রচারকের নাম জড়িয়ে আছে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ওই আলেমের প্রভাবে রাজা ধোভেমি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে দ্বীপপুঞ্জে ইসলাম দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

তবে আবু আল-বারাকাতের পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ‘আল-বারবারি’ উপাধির কারণে তাকে উত্তর আফ্রিকার বারবারি অঞ্চলের মানুষ বলে ধারণা করা হয়। আবার সোমালি ঐতিহ্যে তাকে সোমালিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। অন্য একটি মত অনুযায়ী, তিনি ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত ইউসুফ শামসুদ্দীন আত-তাবরিজি।

তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে মতভেদ থাকলেও রাজা ধোভেমির ইসলাম গ্রহণের ঘটনা মালদ্বীপে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনার কেন্দ্রীয় অংশ।

রাজা ধোভেমি ইসলাম গ্রহণের পর ধীরে ধীরে পুরো দ্বীপপুঞ্জে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং মালদ্বীপ মুসলিম সালতানাতে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে মুসলিম শাসন অব্যাহত থাকে।

মালদ্বীপে ইসলাম আগমনের ইতিহাসের সঙ্গে একটি প্রচলিত অতিপ্রাকৃত কাহিনিও জড়িয়ে রয়েছে। চতুর্দশ শতকে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা মালদ্বীপ সফর করেন। সে সময় স্থানীয় একটি কাহিনি তিনি তার লেখায় তুলে ধরেন।

কাহিনি অনুযায়ী, একসময় দ্বীপবাসীরা ‘রান্নামারি’ নামে এক সামুদ্রিক দানবের আতঙ্কে থাকত। নির্দিষ্ট সময় পরপর ওই দানবের উদ্দেশে একজন তরুণীকে উৎসর্গ করা হতো বলে কাহিনিতে বলা হয়েছে।

এক পর্যায়ে এক আগন্তুক মুসলিম ব্যক্তি দানবটির মোকাবিলা করেন। রাতে তিনি কোরআন তিলাওয়াত করতে করতে সেখানে অবস্থান করেন। এরপর ওই দানব আর ফিরে আসেনি বলে প্রচলিত রয়েছে। ঘটনাটি দেখে রাজা মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন—এমন বর্ণনাও পাওয়া যায়।

তবে এই কাহিনিকে মালদ্বীপে ইসলাম আগমনের আক্ষরিক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি মধ্যযুগে দেশটির ইসলাম গ্রহণ নিয়ে প্রচলিত লোককাহিনির একটি অংশ। ইবনে বতুতার লেখায় এর উল্লেখ থাকায় মালদ্বীপের সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে কাহিনিটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

ইবনে বতুতা মালদ্বীপে কয়েক মাস অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তিনি কাজি বা ইসলামী বিচারকের দায়িত্বও পালন করেন। তার ভ্রমণবৃত্তান্তে মধ্যযুগীয় মালদ্বীপের মুসলিম সমাজ, শাসনব্যবস্থা ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

মালদ্বীপের অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ খোদাই করা প্রবালপাথর দিয়ে নির্মিত। দ্বীপদেশটির সামুদ্রিক পরিবেশ ও স্থানীয় নির্মাণপ্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই স্থাপত্যরীতি দেশটির ইসলামী ঐতিহ্যের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত।

বর্তমানে মালদ্বীপের জনসংখ্যার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম। দেশটির জাতীয় ও সাংবিধানিক পরিচয়ের সঙ্গেও ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত।

ইসলাম আগমনের ৯০০ হিজরি বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রায় নয় শতাব্দী আগে রাজা ধোভেমির ইসলাম গ্রহণ এবং বৌদ্ধ রাজতন্ত্র থেকে মুসলিম সালতানাতে রূপান্তরের ঐতিহাসিক অধ্যায়কে স্মরণ করছে মালদ্বীপ।