ইব্রাহিমি মসজিদ: ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংঘাতের দীর্ঘ অধ্যায়
VLUU L100, M100 / Samsung L100, M100
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের পুরোনো এলাকায় অবস্থিত ইব্রাহিমি মসজিদ। প্রাচীন এই স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় বিশ্বাস, দীর্ঘ ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী এবং ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের বহু অধ্যায়। আল-আকসা মসজিদের সঙ্গে এর স্থাপত্যে কিছুটা মিল রয়েছে। বিশাল পাথরের দেয়ালে ঘেরা স্থাপনাটি বর্তমানে মুসলিম ও ইহুদি উপাসনার জন্য পৃথক অংশে বিভক্ত।
১৯৯৪ সালে এই মসজিদে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পর স্থাপনাটি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। বর্তমানে সেখানে মুসল্লিদের প্রবেশ ও ইবাদতের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়।
ইব্রাহিমি মসজিদ পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলে হেবরন শহরের পুরোনো এলাকায় অবস্থিত। স্থাপনাটির সঙ্গে মাকফিলা গুহার ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, এখানে নবী ইবরাহিম (আ.), তাঁর স্ত্রী সারাহ এবং নবী ইসহাক, ইয়াকুব ও ইউসুফ (আ.)-এর সমাধি রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
মসজিদের ভেতরে এসব সমাধির সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি কক্ষ ও স্থাপনা রয়েছে। ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, এসব স্থাপনার কারণে স্থানটি মুসলমান ও ইহুদি উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
মসজিদটির নাম নবী ইবরাহিম (আ.)-এর নামের সঙ্গে সম্পর্কিত। মুসলমানদের কাছে এটি ‘ইব্রাহিমি মসজিদ’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন সূত্রে ‘আল-ইব্রাহিমি হারাম’ নামটিও ব্যবহৃত হয়।
ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যে স্থানটি ‘মাকফিলা গুহা’ নামে পরিচিত। ইহুদি ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত গুহার নাম অনুসারেই এই নামের প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয়।
স্থানটি ‘পিতৃপুরুষদের গুহা’ নামেও পরিচিত। কারণ, ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যে এখানে সমাধিস্থ ব্যক্তিদের প্রাচীন ধর্মীয় পিতৃপুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইব্রাহিমি মসজিদের আয়তন প্রায় ২ হাজার ৪০ বর্গমিটার। সাদা চুনাপাথরের বিশাল দেয়াল দিয়ে পুরো স্থাপনাটি ঘেরা। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ২ দশমিক ৬৮ মিটার।
স্থাপনাটির নিচের অংশ বিশাল আকারের পাথরের সারি দিয়ে নির্মিত। ওপরের অংশে স্তম্ভ ও অন্যান্য স্থাপত্য উপাদান রয়েছে। মসজিদের ভেতরে খোলা প্রাঙ্গণ, বারান্দা, কক্ষ, করিডর, গম্বুজ ও মিনার রয়েছে।
স্থাপনাটির নিচে মাকফিলা গুহা রয়েছে বলে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়। এই গুহাকে ঘিরেই স্থানটির ধর্মীয় গুরুত্বের বড় একটি অংশ তৈরি হয়েছে।
মসজিদকে ঘিরে থাকা বিশাল প্রাচীরটি ‘হাইর’ নামে পরিচিত। এটি হেরোডের শাসনামলের স্থাপত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ করা হয়।
ইব্রাহিমি মসজিদের বর্তমান স্থাপত্যের প্রাচীন ভিত্তির সঙ্গে রাজা হেরোডের নাম যুক্ত। তাঁর শাসনামলে মাকফিলা গুহাকে ঘিরে বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে রোমান শাসনামলে স্থানটিকে গির্জায় রূপান্তর করা হয়। ৬১৪ খ্রিস্টাব্দে পারস্য বাহিনীর আক্রমণের সময় সেই গির্জা ধ্বংস হয় বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর স্থাপনাটি আবার মসজিদে রূপান্তরিত হয়। উমাইয়া শাসনামলে মসজিদটির সম্প্রসারণ ও সংস্কার করা হয়। এ সময় ছাদ, গম্বুজ এবং সমাধিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।
আব্বাসীয় আমলেও স্থাপনাটির গুরুত্ব বজায় থাকে। এ সময় নতুন দরজা নির্মাণ, লোহার দরজা সংযোজন, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও কার্পেট স্থাপনের মতো বিভিন্ন কাজ করা হয়।
ফাতেমীয় শাসনামলে মসজিদটির স্থাপত্যে আরও পরিবর্তন আসে। ভবনের সঙ্গে গম্বুজ যুক্ত করা হয় এবং এর ধর্মীয় গুরুত্বও আরও বৃদ্ধি পায়।
১১০০ সালে ক্রুসেডাররা হেবরন দখল করার পর ইব্রাহিমি মসজিদে পরিবর্তন আনা হয়। স্থাপনাটি লুট করার পাশাপাশি সেখানে দুর্গ নির্মাণ করা হয়। পরে মসজিদটিকে গির্জায় রূপান্তর করা হয়।
প্রায় ৯০ বছর স্থাপনাটি গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ সময় এর নামের সঙ্গেও খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় পরিচয় যুক্ত হয়।
১১৮৭ সালে হিত্তিনের যুদ্ধে বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন আইয়ুবি হেবরন পুনরুদ্ধার করেন। এরপর ইব্রাহিমি মসজিদ আবার মুসলমানদের উপাসনালয়ে পরিণত হয়।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবি আসকালান থেকে একটি কাঠের মিম্বর এনে মসজিদে স্থাপন করেন। পরে মসজিদটির স্থাপত্যে আরও পরিবর্তন আনা হয় এবং কয়েকটি মিনার নির্মাণ করা হয়।
মসজিদের দেখভাল ও সেবার জন্য কয়েকটি পরিবারকে হেবরনে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল বলেও ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
উসমানি শাসনামলেও ইব্রাহিমি মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন সময়ে এর সংস্কার করা হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ বাহিনী হেবরনে প্রবেশ করলে মসজিদটির ব্যবস্থাপনা ও স্থাপত্যে আরও কিছু পরিবর্তন আসে। সে সময় ইসলামী সর্বোচ্চ পরিষদ মসজিদটির দেখভালের দায়িত্ব নেয় এবং বিভিন্ন সংস্কারকাজ পরিচালনা করে।
১৯৬৭ সালের জুন যুদ্ধের পর হেবরন ইসরায়েলি দখলের অধীনে চলে যায়। এরপর শহরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ইব্রাহিমি মসজিদও ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৯৯৪ সালের হত্যাকাণ্ডের পর মসজিদটির ভেতরের ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা হয়। স্থাপনাটির একটি অংশ মুসলমানদের নামাজের জন্য এবং অন্য অংশ ইহুদিদের উপাসনার জন্য নির্ধারণ করা হয়।
মসজিদের বিভিন্ন অংশ লোহার দরজা ও ব্যারিকেড দিয়ে আলাদা করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে মুসল্লিদের প্রবেশ ও চলাচলের ওপরও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ইব্রাহিমি মসজিদের ইতিহাসে ১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে আছে। ওই দিন ভোরে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বারুখ গোল্ডস্টেইন।
হামলায় ২৯ জন মুসল্লি নিহত এবং ১২৯ জন আহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর তদন্তের জন্য শামগার কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের প্রতিবেদনের পর ইব্রাহিমি মসজিদ মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
এরপর থেকে মসজিদটির একটি অংশ মুসলমানদের নামাজের জন্য এবং অন্য অংশ ইহুদিদের উপাসনার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ইব্রাহিমি মসজিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সালাহউদ্দিন আইয়ুবির মিম্বর। কাঠের তৈরি এই মিম্বরটি প্রাচীন ইসলামী শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
মিম্বরটিতে পেরেকের পরিবর্তে কাঠের বিভিন্ন অংশ পরস্পরের সঙ্গে জোড়া দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। এতে সূক্ষ্ম কাঠের কারুকাজ রয়েছে।
মসজিদের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত এই স্থানটি প্রধান নামাজের স্থানগুলোর একটি। এখানে সালাহউদ্দিনের মিম্বর, মিহরাব এবং সমাধির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে।
মসজিদের মাঝামাঝি অংশে অবস্থিত এই স্থানটি নবী ইবরাহিম (আ.)-এর নামে পরিচিত। এখানে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতীকী কবরের স্থাপনা রয়েছে।
মসজিদের উত্তর অংশে অবস্থিত ইয়াকুবিয়া নামাজের স্থানটি নবী ইয়াকুব (আ.)-এর নামে পরিচিত। এখানেও সমাধির সঙ্গে সম্পর্কিত কক্ষ রয়েছে।
মসজিদের উত্তর-পশ্চিম অংশে মালিকিয়া নামাজের স্থান অবস্থিত। অন্যদিকে জাওলিয়া নামাজের স্থানটি মামলুক আমলের স্থাপত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইব্রাহিমি মসজিদের নিচে মাকফিলা গুহা রয়েছে বলে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়। মুসলিম ও ইহুদি—উভয় ধর্মীয় ঐতিহ্যেই এই স্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গুহার সঙ্গে নবী ইবরাহিম (আ.), ইসহাক (আ.) ও ইয়াকুব (আ.) এবং তাঁদের স্ত্রীদের সমাধির সম্পর্ক রয়েছে বলে ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত।
ইব্রাহিমি মসজিদের কাছে অবস্থিত ইব্রাহিমিয়া তেকিয়া একটি ঐতিহাসিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান। এখানে দরিদ্র ও অভাবী মানুষকে বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে। রমজান মাসে এর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়।
স্থানীয় ঐতিহ্যে এই তেকিয়ার সঙ্গে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর অতিথিপরায়ণতার কাহিনির সম্পর্ক করা হয়। তিনি অতিথি ও পথচারীদের খাবার খাওয়াতেন—এমন বিশ্বাসের সঙ্গে হেবরনের এই দাতব্য ঐতিহ্যকে যুক্ত করা হয়।
ইব্রাহিমি মসজিদ তাই শুধু একটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি একই সঙ্গে মুসলমান ও ইহুদিদের ধর্মীয় বিশ্বাস, বহু শতকের শাসন পরিবর্তন, স্থাপত্যের বিবর্তন এবং ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি স্থান।


