যেসব ব্যক্তির দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না
মানুষ জীবনের প্রতিটি প্রয়োজন, আশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করে। বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি, কল্যাণ ও মঙ্গল কামনায় মুমিনের অন্যতম প্রধান আশ্রয় এই দোয়া। তবে দোয়া কবুলের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্তও রয়েছে। হাদিসে এমন কয়েক শ্রেণির মানুষের কথা বলা হয়েছে, যাদের দোয়া কবুলের পথে বড় বাধা তৈরি হয়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি দোয়া কবুল করি, যখন সে আমার কাছে দোয়া করে।’ (সুরা বাকারা: ১৮৬)। একই সঙ্গে হালাল উপার্জন ও পবিত্র খাবারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কোরআনে। আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুলগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু (হালাল) হতে ভক্ষণ করো এবং নেক কাজ করো।’ (সুরা মুমিন: ৫১)।
ইসলামি স্কলারদের মতে, হারাম উপার্জন ও হারাম খাদ্য-পানীয় দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। এ ছাড়া দোয়া করে হতাশ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর নির্দেশিত দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো বিষয়ও দোয়া কবুলের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
হারাম খাদ্য ও উপার্জন
হারাম খাবার গ্রহণ এবং হারাম উপার্জনের মাধ্যমে জীবনযাপন করা দোয়া কবুলের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। রাসুলুল্লাহ (সা.) হারাম খাবার, পানীয় ও পোশাক থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এক হাদিসে রাসুল (সা.) হজরত সাদ (রা.)-কে বলেন, ‘হে সাদ, তোমার খাদ্য পবিত্র করো, তাহলে মুস্তাজাবুদ দাওয়াত (যার দোয়া কবুল হয়) হতে পারবে।’ (আল মুজামুল আওসাত: ৬৪৯৫)
অর্থাৎ দোয়া কবুলের প্রত্যাশা থাকলে উপার্জন ও খাদ্য হালাল হওয়া জরুরি।
দোয়া করে হতাশ হয়ে যাওয়া
দোয়া করার পর দ্রুত ফল না পেয়ে হতাশ হয়ে যাওয়াও মুমিনের জন্য অনুচিত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়ে থাকে; যদি-না সে তাড়াহুড়ো করে আর বলে, আমি দোয়া করলাম, কিন্তু আমার দোয়া তো কবুল হলো না।’ (বোখারি: ৬৩৪০)
তাই দোয়া করার পর আল্লাহর রহমত ও সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা জরুরি। দোয়ার ফল পেতে বিলম্ব হলেও বান্দার উচিত হতাশ না হওয়া।
আল্লাহর নির্দেশিত দায়িত্ব পালন না করা
সৎকাজের আদেশ ও অন্যায় প্রতিরোধ করা মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ দায়িত্ব থেকে দূরে সরে গেলে দোয়া কবুলের ক্ষেত্রেও বাধা আসতে পারে।
হজরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমরা সৎ কাজের জন্য আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে। তা না হলে আল্লাহ তায়ালা শিগগির তোমাদের ওপর তার শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। তোমরা তখন তার কাছে দোয়া করলেও তিনি তোমাদের সেই দোয়া গ্রহণ করবেন না।’ (তিরমিজি: ২১৬৯)
তাই শুধু দোয়া করাই নয়, আল্লাহর নির্দেশিত দায়িত্ব ও কর্তব্যও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
হাদিসে এসেছে, কোনো মুসলিম গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া না করলে আল্লাহ তার দোয়ার বিনিময়ে তিনটির কোনো একটি দান করেন—তার কাঙ্ক্ষিত বিষয় দুনিয়ায় দিয়ে দেন, তা পরকালের জন্য সঞ্চয় করে রাখেন অথবা কোনো অকল্যাণ ও বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করেন। (আত-তারগীব: ১৬৩৩)
হাদিসের আলোকে ইসলামি স্কলাররা বলেন, শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি এ গুনাহ থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হতে পারেন।
অমনোযোগী মনে দোয়া করা
দোয়ার সময় মনোযোগ ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মুখে দোয়া করলেই হবে না; অন্তর থেকেও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কবুল হওয়ার পূর্ণ আস্থা নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করো। জেনে রেখো, আল্লাহ অমনোযোগী ও অসাড় মনের দোয়া কবুল করেন না।’ (তিরমিজি: ৩৪৭৯)
তাই দোয়ার সময় মনকে একাগ্র রাখা, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখা এবং নিজের জীবন-জীবিকা হালাল রাখার চেষ্টা করা জরুরি।


