যেসব কারণে দোয়া কবুল হয় না
দোয়া মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে বান্দা সরাসরি তার রবের কাছে নিজের প্রয়োজন, দুর্বলতা ও আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরে। মহান আল্লাহ বান্দাকে তাঁর কাছে প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং দোয়ার জবাব দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা মুমিন: ৬০)
তবে দোয়া করার ক্ষেত্রে কিছু আদব ও শর্ত রয়েছে। সেগুলো উপেক্ষা করলে দোয়া কবুলের পথে বাধা তৈরি হতে পারে। অনেক সময় মানুষ দীর্ঘদিন দোয়া করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। অথচ নিজের আমল, উপার্জন ও দোয়ার পদ্ধতির দিকে নজর দিলে সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব।
দোয়া কবুলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে—এমন ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
১. ইখলাস ও একনিষ্ঠতার ঘাটতি
দোয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও একনিষ্ঠতা। লোকদেখানো, অন্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কিংবা অন্তরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ওপর ভরসা রেখে দোয়া করা উচিত নয়।
বান্দাকে নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে—
‘অতএব, তোমরা একনিষ্ঠচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করো।’
(সুরা গাফির: ১৪)
২. তওবা ও ইস্তিগফার থেকে দূরে থাকা
মানুষ ভুল ও গুনাহের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু গুনাহ করার পর অনুতপ্ত না হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা না চাওয়া দোয়া কবুলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হজরত মুসা (আ.)-এর একটি দোয়া কোরআনে এসেছে—
‘হে আমার রব, নিশ্চয় আমি আমার নিজের প্রতি জুলুম করেছি। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ এরপর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। (সুরা কাসাস: ১৬)
এ ছাড়া সুরা নুহের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতে ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত, বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও কল্যাণ লাভের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই দোয়ার পাশাপাশি নিয়মিত তওবা ও ইস্তিগফার করাও জরুরি।
৩. আল্লাহর আনুগত্যে ঘাটতি
শুধু বিপদে পড়লে আল্লাহকে স্মরণ করা, আর স্বাভাবিক সময়ে তাঁর নির্দেশ অমান্য করা একজন মুমিনের জন্য কাম্য নয়। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে।
হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া কবুল হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে কোরআনে বলা হয়েছে, তারা সৎকাজে অগ্রসর হতেন, আশা ও ভয় নিয়ে আল্লাহকে ডাকতেন এবং তাঁর সামনে বিনয়ী ছিলেন। (সুরা আম্বিয়া: ৮৯-৯০)
অর্থাৎ দোয়ার সঙ্গে সৎকর্ম, আনুগত্য ও আল্লাহভীতির সম্পর্ক রয়েছে।
৪. উদাসীন ও বিক্ষিপ্ত মনে দোয়া করা
দোয়ার সময় শুধু মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করলেই যথেষ্ট নয়। নিজের প্রার্থনার প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং অন্তর থেকে আল্লাহর কাছে চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
হাদিসে এসেছে—
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ উদাসীন ও বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে করা দোয়া কবুল করেন না।’
(সহিহ মুসলিম: ২৭২২)
তাই দোয়ার সময় মনকে অন্য চিন্তা থেকে সরিয়ে বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত।
৫. নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ না করা
আল্লাহ সর্বশক্তিমান, আর মানুষ তাঁর মুখাপেক্ষী। তাই দোয়ার সময় অহংকার বা ঔদ্ধত্যের পরিবর্তে নিজের দুর্বলতা, প্রয়োজন ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করা উচিত।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন—
‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো বিনীতভাবে ও গোপনে।’
(সুরা আরাফ: ৫৫)
অর্থাৎ দোয়ার অন্যতম সৌন্দর্য হলো বিনয়, নম্রতা ও একান্ত নির্ভরতা।
৬. হারাম খাদ্য, পানীয় ও উপার্জন
দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। হারাম উপার্জনে জীবিকা নির্বাহ করে শুধু দোয়া করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা পুষ্ট হয়েছে—‘তবে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’
(সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
তাই দোয়ার পাশাপাশি নিজের উপার্জন, খাদ্য ও জীবনযাপনের হালাল-হারামের বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি।
আরও যেসব বিষয় থেকে বিরত থাকা উচিত
গুনাহের কাজের জন্য দোয়া করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা এবং দোয়া করে দ্রুত ফল না পেয়ে হতাশ হয়ে যাওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।
হাদিসে দোয়া কবুলের ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করতে নিষেধ করা হয়েছে। কোনো বান্দা যতক্ষণ না বলে যে, ‘আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি’—ততক্ষণ তার দোয়া কবুল হতে থাকবে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ২৭৪৫)
দোয়ার সঙ্গে থাকতে হবে ধৈর্য ও বিশ্বাস
দোয়া শুধু কোনো কিছু পাওয়ার মাধ্যম নয়; এটি বান্দার সঙ্গে তার রবের সম্পর্কের অন্যতম প্রকাশ। তাই দোয়া করার সময় আন্তরিকতা, বিনয়, তওবা, হালাল উপার্জন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা জরুরি।
কাঙ্ক্ষিত ফল দেরিতে এলেও হতাশ হওয়া উচিত নয়। বরং নিজের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে ধৈর্য ও বিশ্বাসের সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা চালিয়ে যেতে হবে।


