আজ ঐতিহাসিক ৩৬ জুলাই
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের অবসান, পালিয়ে যান শেখ হাসিনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সেদিন ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্দোলনকারীদের কাছে দিনটি ছিল স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিজয়ের দিন।
২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। পরবর্তী প্রায় সাড়ে ১৫ বছরে নির্বাচন, ভোটাধিকার, বাক্স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে তার সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক তৈরি হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মহল ওই সময়ের নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম, ভোট জালিয়াতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ তোলে।
সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে তাদের শাসনামলের প্রধান অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছিল। তবে শেষ দিকে অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
আন্দোলনের সূত্রপাত ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ তার বক্তব্যকে ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা করে প্রতিবাদে নামেন।
সেদিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে হাজারো শিক্ষার্থী বেরিয়ে এসে স্লোগান দেন—‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’
পরদিন ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আন্দোলনকারীদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ। এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদেরও সংঘাত হয়।
আবু সাঈদের মৃত্যু, আন্দোলনের বিস্তার
১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলন দ্রুত দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং তা আরও ব্যাপক রূপ নেয়।
পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকার কারফিউ জারি করে এবং বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, বলপ্রয়োগ এবং হতাহতের ঘটনা নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় বহু শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ নিহত ও আহত হন। সহিংসতার ঘটনায় শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে রাজপথে নামেন।
৯ দফা থেকে এক দফা
আন্দোলনকারীরা শুরুতে বিভিন্ন দাবিতে ৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের দাবি সরকার পতনের এক দফায় রূপ নেয়।
আন্দোলন চলাকালে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ককে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বক্তব্য রেকর্ড করানোর অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনায় আন্দোলন আরও তীব্র হয়।
২ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আন্দোলনের ৯ দফা দাবি তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। এরপর ৪ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওই দিন বহু মানুষ নিহত ও আহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়।
৫ আগস্ট: ক্ষমতার অবসান ও দেশত্যাগ
৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হলে সেদিন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে দেশ ত্যাগ করেন।
ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ভারতের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের অবসান ঘটে।
৫ আগস্টের ঘটনাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়। আন্দোলনকারীদের কাছে দিনটি ছাত্র-জনতার বিজয়ের প্রতীক হলেও, এই সময়ের সহিংসতা, প্রাণহানি, রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা ও মূল্যায়ন এখনো চলমান।


