রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর আজ
ঘরে ফেরা হয়নি রোহিঙ্গাদের, প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার নয় বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানের পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। নয় বছর পরও তাদের বড় পরিসরে প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়ের বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ।
প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন নেই
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, বসতভিটা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন বাস্তবে এগোয়নি। নয় বছর পরও একজন বড় আকারের প্রত্যাবাসন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজ দেশে ফিরতে পারেননি।
রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা যথেষ্ট নয়। মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা ফিরতে চান না। ফলে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আস্থার সংকট এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বদলে গেছে রাখাইনের পরিস্থিতি
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগের সময় রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেখানে ক্ষমতার সমীকরণ ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে আরাকান আর্মির অভিযান জোরদার হওয়ার পর রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে। সীমান্তবর্তী মংডুসহ বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কাদের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হবে এবং ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে আগের প্রত্যাবাসন কাঠামো এখন অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ
রাখাইনে সংঘাত থামেনি। বরং ২০২৪ সালের পর নতুন করে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পুরোনো সংকটের সমাধান না হওয়ার পাশাপাশি নতুন করে শরণার্থী যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বসবাস। দীর্ঘদিনের শরণার্থীজীবনে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তাও কমছে
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও মানবিক সহায়তা কমে আসায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় এখন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা বললেও বাংলাদেশের মূল দাবি হচ্ছে—সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করা।
যাচাই প্রক্রিয়ায় কিছু অগ্রগতি
প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাইয়ের কিছু অগ্রগতির কথা জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনকে যাচাই করা হয়েছে বলে মিয়ানমার জানিয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হচ্ছে বলে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে যাচাই প্রক্রিয়া এগোলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসনের সময়সূচি বা কার্যকর রোডম্যাপ এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিজ দেশে ফেরার আশা থাকলেও অনিশ্চয়তাও কাটছে না।
ক্যাম্পে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বিভিন্ন ক্যাম্পে অপরাধ, মাদক, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব কারণে শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা নেতাদের মতে, নয় বছর ধরে ক্যাম্পে বসবাস তাদের জন্য কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তারা নিজ ভূমিতে ফিরতে চান। তবে সেই ফেরত অবশ্যই নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে।
সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রত্যাবাসন
রোহিঙ্গা সংকট এখন দশম বছরে প্রবেশ করছে। এত দীর্ঘ সময়েও প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য সংকটটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, রাখাইনে আরাকান আর্মির প্রভাব এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্ন প্রত্যাবাসনের পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের সমাধানে শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনা যথেষ্ট নয়। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রয়োজন।
নয় বছর পরও রোহিঙ্গাদের সামনে তাই একই প্রশ্ন—কবে ফিরবেন নিজ ভূমিতে? আর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের একটি টেকসই সমাধান কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।


