বিশ্ব ডাক দিবস আজ

সেবা বাড়ছে, তবু আয়-ব্যয়ের ঘাটতি কাটছে না ডাক বিভাগের

সেবা বাড়ছে, তবু আয়-ব্যয়ের ঘাটতি কাটছে না ডাক বিভাগের
৯ অক্টোবর ২০২৬

একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই অপেক্ষায় থাকা পরিবারের মনে জেগে উঠত আনন্দ। দূর শহর কিংবা প্রবাস থেকে আসা একটি চিঠির জন্য অপেক্ষা চলত দিনের পর দিন। হলুদ খামের ভাঁজে লেখা কয়েকটি শব্দেই মুছে যেত দূরত্ব, কাগজে মিশে থাকত ভালোবাসা, অভিমান কিংবা বিচ্ছেদের অনুভূতি।

প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে মুহূর্তেই পৌঁছে যায় খবর, ছবি কিংবা ব্যক্তিগত বার্তা। চিঠির প্রচলন কমে যাওয়ায় ডাক বিভাগের ঐতিহ্যবাহী সেবার গুরুত্বও বদলেছে। এখন সরকারি নথি, আদালতের কাগজপত্র, পাসপোর্ট, ভূমির রেকর্ড, পার্সেল ও ই-কমার্সের পণ্য পরিবহনে গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। চালু হচ্ছে নতুন নতুন সেবাও। তবু আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমছে না।

আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিশ্ব ডাক দিবস। এ উপলক্ষে ডাক বিভাগের সেবা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এলেও আর্থিক ভারসাম্য ফেরানোই প্রতিষ্ঠানটির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

ডাকপত্র বাড়লেও আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি

দেশে প্রায় ১০ হাজার ডাকঘর রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি সরাসরি ডাক বিভাগ পরিচালনা করে; বাকিগুলো পরিচালিত হয় এজেন্টের মাধ্যমে।

ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি ও অন্যান্য চিঠিপত্র মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ ডাক পরিবহন করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ১০ লাখে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ হয়েছে।

ডাক পরিবহনের পরিমাণ বাড়লেও ব্যয়ের তুলনায় আয় এখনও অনেক কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডাক বিভাগের আয় ছিল প্রায় ২১৯ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ২৫৩ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৩৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তিন বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা। তবে বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। পেনশন ও আনুতোষিক খাতে ব্যয় ২৬০ কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে বাজেটের প্রায় ৯৩ শতাংশ চলে যায় বেতন, পেনশন ও প্রশাসনিক ব্যয়ে। ফলে নতুন সেবা থেকে আয় বাড়লেও আর্থিক ঘাটতি কাটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

চিঠির জায়গায় পার্সেল ও ডিজিটাল সেবা

ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়ার পর আয় বাড়াতে সেবার ধরন পরিবর্তনের চেষ্টা করছে ডাক বিভাগ। ২০১৯ সালে চালু হওয়া ‘নগদ’ থেকে আগে বছরে গড়ে ১৩ থেকে ১৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেত প্রতিষ্ঠানটি। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১৮ কোটি টাকা।

এ ছাড়া পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ভূমির খতিয়ান বা পরচা গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সেবা চালু হয়েছে। এ পর্যন্ত ৭ লাখের বেশি ভূমি রেকর্ড গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও সেবার পরিধি বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেশে ও বিদেশে থাকা ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন এ সুবিধা নিয়েছেন। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে চালু হয়েছে স্পিড পোস্ট। চলতি বছরের মার্চে সেবাটি চালুর পর এ পর্যন্ত প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পার্সেল পরিবহনেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ২৪৩ টন পণ্য পাঠানো হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৩১৬ টনে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় বাজারে পণ্য পরিবহন বাড়াতেও নেওয়া হচ্ছে নতুন উদ্যোগ।

বেসরকারি কুরিয়ারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চ্যালেঞ্জ

দ্রুত ডেলিভারি, মোবাইল অ্যাপে পণ্যের অবস্থান শনাক্তকরণ এবং বাসা থেকে পণ্য সংগ্রহ ও পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। বিপরীতে ডাক বিভাগের অনেক কার্যক্রম এখনও পুরোনো অবকাঠামো ও জনবলসংকটের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

বিশেষ করে পচনশীল পণ্য পরিবহনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যাপ্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত যানবাহন ও আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় পরিবহনে দেরি হলে ফলসহ বিভিন্ন পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতিও সেবার মান বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ফলে পার্সেল ও ই-কমার্সের বাজারে চাহিদা বাড়লেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ডাক বিভাগকে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার আধুনিকায়নে আরও মনোযোগ দিতে হচ্ছে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিসে নতুন সম্ভাবনা

ব্যয় কমানো ও সেবার পরিধি বাড়াতে গত ২৯ জুলাই ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস ও পোস্ট পিকআপ পয়েন্ট চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনাসহ ১২টি অঞ্চলে এ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়েও তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ব্যবস্থায় চুক্তির ভিত্তিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে চিঠি ও পার্সেল সংগ্রহ এবং বিতরণ করতে পারবে। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী এসব কেন্দ্র সরকারি ডাকঘরের তুলনায় বেশি সময় খোলা রাখার সুযোগও থাকবে।

ডাক বিভাগের আশা, ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের মাধ্যমে সেবা মানুষের কাছে আরও সহজে পৌঁছানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানো যাবে। তবে এ উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কতটা কমাতে পারবে, তা নির্ভর করবে সেবার মান, গ্রাহক চাহিদা ও কার্যক্রমের দক্ষতার ওপর।

বিশ্ব ডাক দিবসে নানা আয়োজন

এ বছরের বিশ্ব ডাক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’। দিবসটি উপলক্ষে ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর দেশে পালিত হচ্ছে ডাক সপ্তাহ। এ সময়ে সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম ছাড়া শুক্র ও শনিবারও ডাকঘরের অন্যান্য সেবা চালু রাখার কথা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছে চিঠি উৎসব, ডাকটিকিট প্রদর্শনী ও ডাকমেলার।

বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ডাক বিভাগ এখন আর শুধু প্রথাগত চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়; এটি আধুনিক ও বহুমুখী সেবা নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। জনগণের আস্থা অর্জনই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।

তবে ডাক বিভাগের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত সেবা দিয়ে গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ব্যয় কাঠামো সামলে আর্থিক ঘাটতি কমানো। নতুন সেবা ও ফ্র্যাঞ্চাইজি কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ আর্থিক সক্ষমতা।