৭ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হবে
দেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় রাজধানী ঢাকায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সম্ভাব্য ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীর ঘনবসতি ও তীব্র যানজটের কারণে উদ্ধারকারী দলের ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকার ৪১টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জাম মজুত রাখা হয়েছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে অনেক এলাকায় সড়ক বন্ধ হয়ে যেতে পারে কিংবা যানবাহন চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। তাই উদ্ধারকাজ যাতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থাকে, সে জন্য রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আগেই রাখা হয়েছে।
ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা দিতে দেশের ১০০টি বিশেষ ফায়ার স্টেশনকে চিহ্নিত করে রাখার কথাও জানান তিনি। এসব স্টেশনের ইউনিট প্রয়োজনে দ্রুত ঢাকায় এসে উদ্ধারকাজে যুক্ত হবে। পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং সিটি করপোরেশনের ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মহাপরিচালক জানান, ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের দ্রুত শনাক্ত করতে ভবিষ্যতে বিশেষ ইমেজিং প্রযুক্তি ও সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্গম এলাকা ও বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ এবং উদ্ধারকাজে ড্রোন ও রেসকিউ হেলিকপ্টার যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাড়ছে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা
বর্তমানে সারা দেশে ৫৩৮টি ফায়ার স্টেশন চালু রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দেশে প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার ৭০০টি স্টেশন। ঘাটতি কমাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ৯৯৭টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
নতুন ১২টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ এবং আটটি পুরোনো স্টেশন পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। তবে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শুধু জনসংখ্যার ভিত্তিতে স্টেশন স্থাপন যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি। ঝুঁকি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়কব্যবস্থা ও যানজট বিবেচনায় নিয়ে স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
রেসপন্স টাইম কমাতে ‘১০২’
জরুরি সেবায় দ্রুত সাড়া দিতে টোল-ফ্রি ‘১০২’ নম্বর চালুর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন মহাপরিচালক। পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো যানজটপূর্ণ এলাকায় বড় দুর্ঘটনায় একসঙ্গে একাধিক ইউনিট পাঠানো হচ্ছে, যাতে একটি ইউনিট যানজটে আটকে পড়লেও অন্য ইউনিট বিকল্প পথে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব কমিউনিটি ভলান্টিয়ার তৈরির উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে। গত বছর ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ৪০০ স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হয়েছে। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ফায়ার স্টেশনের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য আলাদা যোগাযোগব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
নিয়োগে প্রযুক্তি, অনলাইনে ফায়ার লাইসেন্স
ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি, ভিডিও রেকর্ডিংসহ প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান মহাপরিচালক। তাঁর দাবি, নিয়োগে অনিয়ম ও প্রতারণার সুযোগ বন্ধ করতে পুরো প্রক্রিয়াকে একটি স্থায়ী সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে।
অন্যদিকে ফায়ার লাইসেন্স, ফায়ার সেফটি প্ল্যান ও এনওসি অনলাইনে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আবেদন, পরিদর্শন ও লাইসেন্স প্রদানের তথ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কিউআর কোডযুক্ত লাইসেন্সের পাশাপাশি ই-চালানের মাধ্যমে সরাসরি সরকারি কোষাগারে ফি জমার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মহাপরিচালক জানান, ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর ফলে ফায়ার সার্ভিসের রাজস্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
নিজস্ব সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিটের উদ্যোগ
বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশের প্রতিটি বিভাগে একটি করে স্পেশাল রেসকিউ টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পূর্বাচলে সদর অধিদপ্তরের অধীনে ৫০ সদস্যের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সরঞ্জাম ও কারিগরি সক্ষমতা ধাপে ধাপে তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে কেমিক্যাল দুর্ঘটনা মোকাবিলায় ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বরে অস্থায়ীভাবে একটি বিশেষ কেমিক্যাল ইউনিট গঠন করা হয়েছে। পুরান ঢাকা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
সচেতনতায় কমবে দুর্ঘটনা
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো গেলে অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। ২০২৫ সালে ফায়ার সার্ভিস ২৭ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডে সাড়া দিয়েছে। এ সময় সারা দেশে বিপুলসংখ্যক মহড়া, ফায়ার ড্রিল, গণসংযোগ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
তিনি ভবন মালিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ফায়ার সেফটি আইন মেনে ভবন নির্মাণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
মহাপরিচালক বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ফায়ার সার্ভিসকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত সেবাদানে সক্ষম ও দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো হবে।


