ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলে নতুন নীতিমালা

রাজধানী
ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলে নতুন নীতিমালা
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নিবন্ধন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলতে পারবে না। পাশাপাশি জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং প্রধান বাস চলাচলের সড়কে এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা, যাত্রী ধারণক্ষমতা, নিবন্ধন ও নবায়ন ফি, চলাচলের রুট, পার্কিং এবং ব্যাটারি চার্জিংয়ের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। বিধিমালা অমান্য করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ নামে জারি করা বিধিমালাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

নির্ধারিত হবে ই-রিকশার সংখ্যা ও চলাচলের এলাকা

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি সিটি করপোরেশন সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজস্ব এলাকায় ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করবে। প্রয়োজনে পুরো সিটি করপোরেশন এলাকায় অথবা নির্দিষ্ট জোনে এসব যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া যাবে।

ই-রিকশা চলাচলের রুটও নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ। জোনভিত্তিক রুট ব্যবস্থার আওতায় এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলতে পারবে না। প্রতিটি জোনের জন্য ই-রিকশার সংখ্যা ও নির্দিষ্ট রং নির্ধারণের বিধানও রাখা হয়েছে।

সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার

বিধিমালায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার রাখতে হবে। প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডোর এবং প্রশাসনের নিষিদ্ধ ঘোষিত সড়কে ই-রিকশা চলতে পারবে না। ফুটপাতেও এসব যান চালানো নিষিদ্ধ।

চালকদের সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য যানকে অতিক্রম এবং অনিয়মতান্ত্রিকভাবে লেন পরিবর্তন করা যাবে না।

সর্বোচ্চ চার যাত্রী বহনের সুযোগ

ই-রিকশার আকার অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী পরিবহন করা যাবে। যাত্রীদের হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য বহন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪০ ডেসিবেলের বেশি তীব্রতার হর্ন ব্যবহার করা যাবে না।

নিবন্ধনে লাগবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ফিটনেস সনদ

নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, সদ্য তোলা দুই কপি পাসপোর্ট আকারের সত্যায়িত ছবি, নিবন্ধন ফি জমার রসিদ এবং নির্ধারিত ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে।

আবেদন যাচাই-বাছাই করে সব শর্ত পূরণ হলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রয়েছে। প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। নিবন্ধন নম্বরটি গাড়ির দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে।

নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করা যাবে। তবে একটি সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না।

নিবন্ধন ও নবায়ন ফি কত?

বিধিমালায় ই-রিকশার যাত্রী ধারণক্ষমতা অনুযায়ী নিবন্ধন ও বার্ষিক নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

  • দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশা: এককালীন নিবন্ধন ফি ৮ হাজার টাকা, বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা।
  • চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশা: এককালীন নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা, বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা।
  • ফিটনেস সনদ: সব ধরনের ই-রিকশার জন্য ১ হাজার টাকা।

সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বিনামূল্যে কিউআর কোডযুক্ত নম্বর প্লেট ও বিস্তারিত তথ্যসংবলিত ব্লু-বুক সরবরাহ করবে। নিবন্ধন ও নবায়ন ফি থেকে পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের রাজস্ব হিসেবে গণ্য হবে।

বুয়েটের মানদণ্ড পূরণ বাধ্যতামূলক

প্রতিটি ই-রিকশাকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবিষয়ক শর্ত পূরণ করতে হবে। ফিটনেস সনদ এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর ছাড়া কোনো ই-রিকশার নিবন্ধন বা নবায়ন করা যাবে না।

বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী ই-রিকশাগুলোকেও নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন করে অনুমোদন নিতে হবে। নিবন্ধনের তারিখ থেকে একটি ই-রিকশার ব্যবহারযোগ্য অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর। এ সময় শেষ হলে নম্বর প্লেটসহ নিবন্ধন বাতিল করতে হবে।

পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাগুলোকে বিমার আওতায় আনার বিধানও রাখা হয়েছে।

নির্দিষ্ট স্থানে পার্কিং ও ব্যাটারি চার্জিং

ই-রিকশার পার্কিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিটি ওয়ার্ডে বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয় জায়গা নির্ধারণ করবে। ব্যাটারি চার্জ করতে হবে অনুমোদিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট অথবা নির্দিষ্ট গ্যারেজে। এসব স্থানে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি উন্মুক্ত স্থানে, মাটিতে, জলাশয়ে কিংবা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর কাজও করা যাবে না।

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনে কমিটি

ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কমিটি বুয়েট নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য যাচাই করে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সুপারিশ করবে।

দুর্ঘটনায় চালকের দায়বদ্ধতা

নতুন বিধিমালায় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি থামিয়ে আহত ব্যক্তিদের সহায়তা করতে হবে এবং পুলিশকে জানাতে হবে।

নিবন্ধন ছাড়া ই-রিকশা চালানো, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার, মোটর বা গাড়ির কাঠামো পরিবর্তন, নিষিদ্ধ সড়কে চলাচল, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য এবং দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ ই-রিকশা চলাচল বন্ধে মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে অথবা পৃথকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

নতুন বিধিমালার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচলের রুট, গতি, নিবন্ধন ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।