ফিরে দেখা জুলাই গণঅভ্যুত্থান

ইতিহাসের এই দিনে: হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ককে নিয়ে যায় ডিবি

ইতিহাসের এই দিনে: হাসপাতাল থেকে তিন সমন্বয়ককে নিয়ে যায় ডিবি

২০২৪ সালের জুলাই ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও অস্থির সময়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যেই রূপ নেয় দেশব্যাপী সংঘাতে। ২৬ জুলাই ছিল সেই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত দিনগুলোর একটি। এদিন রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে আন্দোলনের তিন সমন্বয়ককে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হেফাজতে নেয়। একই দিনে দেশজুড়ে চলে ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান, আসে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও বাড়তে থাকে উত্তেজনা।

হাসপাতালে ডিবির উপস্থিতি, শুরু নতুন বিতর্ক

২৬ জুলাই বিকেলে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক—নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদার। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি হাসপাতালে প্রবেশ করে প্রথমে নাহিদ ইসলামকে এবং পরে আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকেরকে নিয়ে যান বলে অভিযোগ করে তাদের পরিবার।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর রাতে ডিবি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, নিরাপত্তার স্বার্থে তিন সমন্বয়ককে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার বিষয়ে তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে বলেও জানানো হয়।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও একই ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, সমন্বয়করা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন এবং তাদের প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকায় নিরাপত্তার জন্যই ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

এর আগেও তুলে নেওয়া হয়েছিল

এই তিন সমন্বয়কের জন্য এটি ছিল প্রথম ঘটনা নয়। ১৯ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির পর নাহিদ ইসলামকে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া থেকে তুলে নেওয়া হয়। দুই দিন পর পূর্বাচল এলাকায় তাকে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। একই সময়ে আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকেরকেও তুলে নেওয়া হয়েছিল। পাঁচ দিন পর তাদের রাজধানীর পৃথক এলাকায় রেখে যাওয়া হয়। পরে তারা চিকিৎসার জন্য গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখান থেকেই ২৬ জুলাই আবার তাদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।

দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান

২৬ জুলাই আন্দোলন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ‘ব্লক রেইড’ পরিচালনা করা হয়। সরকারি হিসাবে, ১৭ থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনে সারা দেশে গ্রেপ্তার হন ৬ হাজার ২৬৪ জন। শুধু রাজধানীতেই গ্রেপ্তার করা হয় ২ হাজার ৪১৬ জনকে।

একই সময়ে নতুন করে ঢাকায় আটটি এবং ঢাকার বাইরে ২২টি মামলা দায়ের হয়। আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়।

আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ

জুলাইয়ের সহিংসতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি গুলি ব্যবহারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ।

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি ড. রুপা হক বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান জানতে চান। কানাডাও আন্দোলন চলাকালে সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।

অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সাংবিধানিক অধিকার এবং ভিন্নমত প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়। একই ধরনের বক্তব্য দেয় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), যারা নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্বিচার মামলা ও গণগ্রেপ্তার বন্ধের দাবি জানায়।

ইতিহাসের মোড় ঘোরানো দিন

২৬ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি দিনের সংবাদ ছিল না; এটি পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায়ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আন্দোলনের নেতৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, গণগ্রেপ্তার, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং সরকারের অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে দিনটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

আজও ২৬ জুলাই ২০২৪ ফিরে দেখলে স্পষ্ট হয়, সেদিনের প্রতিটি ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক আলোচনার বিষয় ছিল না; বরং পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তন, জনমত এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলোর ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।