বনানীতে ফুডকোর্টের নির্মিত দোকানকে ‘খালি জায়গা’ হিসেবে দেখিয়ে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতাকে ভাড়া
ডিএনসিসি ফুডকোর্ট
রাজধানীর বনানীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি ফুডকোর্টের আটটি নির্মিত দোকানকে ‘খালি জায়গা’ হিসেবে দেখিয়ে অস্থায়ীভাবে ভাড়া দেওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রচলিত বিধি অনুসরণ না করে বিশেষ সুবিধা দিতে সম্পত্তির ধরন পরিবর্তন করে মাত্র ছয় মাসের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে করপোরেশনের সম্ভাব্য রাজস্ব কমেছে, অন্যদিকে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
বনানী কাঁচাবাজারসংলগ্ন ডিএনসিসির ফুডকোর্টের মোট এক হাজার ৩৯৮ বর্গফুট জায়গার মধ্যে নির্মিত আটটি দোকান ছয় মাসের জন্য ভাড়া পেয়েছেন ১৯নং ওয়ার্ড বিএনপির বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন। নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী প্রতি বর্গফুটের দৈনিক ভাড়া মাত্র দেড় টাকা। সে হিসাবে প্রায় ৩০০ বর্গফুটের একটি দোকানের মাসিক ভাড়া দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা।
তবে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী নির্মিত দোকানকে ‘খালি জায়গা’ হিসেবে দেখিয়ে ভাড়া দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁদের দাবি, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে সম্পত্তির প্রকৃতি পরিবর্তন করে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদিও করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফুডকোর্ট পরিচালনা বা ইজারা দেওয়ার জন্য এখনো কোনো নীতিমালা না থাকায় আপাতত ‘স্পেস’ হিসেবে অস্থায়ী ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, বনানী কাঁচাবাজারের পাশের এই জায়গাটি একসময় গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হতো। সাবেক মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে সেখানে ফুডকোর্ট নির্মাণ করা হলেও তাঁর মৃত্যুর পর সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন বা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে দীর্ঘদিন অব্যবস্থাপনায় থাকা ফুডকোর্টটি দখলের কবলে পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ এক স্থানীয় নেতা সেখানে অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে ভাড়া আদায়ের অভিযোগে আলোচনায় আসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের হাতে যায়। এরপর থেকে সেখান থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে দেওয়া অনুমতিপত্রে সম্পত্তির বিবরণে ‘বনানী ডিএনসিসি কাঁচাবাজারের পশ্চিম পাশে এক হাজার ৩৯৮ বর্গফুট জায়গা’ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বন্ধনীর মধ্যে লেখা রয়েছে ‘নির্মিত আটটি ফুডকোর্ট’।
গত ১০ জুন নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে ফুডকোর্টের জায়গা বরাদ্দের আবেদন করেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির অভিযোগে তিনি আগেই বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন।
ডিএনসিসির নথি অনুযায়ী, আবেদন জমা দেওয়ার মাত্র ১২ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে তাঁকে অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর এক সপ্তাহ পরই জায়গা ব্যবহারের অনুমতিপত্র দেওয়া হয়।
করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, আটটি দোকানের প্রতিটির ছয় মাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাসিক ভাড়া প্রায় ৯ হাজার ৮৩৫ টাকা। পাশাপাশি প্রতিটি দোকানের বিপরীতে এক লাখ টাকা করে ফেরতযোগ্য জামানত নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার ভাষ্য, আব্দুল্লাহ আল মামুনের প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ নেওয়া হলেও আটটি দোকান বাস্তবে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের বিভিন্ন নেতার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে ফুডকোর্টের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কেবল একটি দোকান পেয়েছেন। বাকি দোকানগুলো কারা নিয়েছেন, সে বিষয়ে স্থানীয় যুবদলের দুই নেতার কাছে তথ্য রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।


